সপ্তাহের সাতকাহন - এসো মা লক্ষ্মী

Durga Puja / সপ্তাহের সাতকাহন:

 

প্রতি

শ্রীশ্রী মাতালক্ষ্মী মা,

     তোমার রাঙ্গা পাদপদ্মে এই অধমের শতকোটি প্রণাম নিও। এই চিঠি ভারতীয় ডাকে তোমার কাছে আগামী পাঁচ তারিখের আগে পৌঁছুবে কিনা নিশ্চিত নই, তাই ডট-কমের যুগে www.tripuraindia.com- মারফত তোমাকে এই খোলা চিঠি দিতে বাধ্য হলাম।

      মাগো, তুমি এমন একটা সময়ে আসছো, যখন আমরা দুর্গাপূজার আমেজ এখনো কাটিয়ে শেষ করে উঠতে পারিনি । তুমি তো নিশ্চয় জানো, তোমাদের পুরো ফ্যামিলির পুজো চারদিনের । কিন্তু এখন আমরা যে সাতদিনের আগে তোমাদের কিছুতেই ছাড়তে চাইছি না। এখন তো মা সেলফির যুগ । তাই তোমাদের  এতো  সুন্দর রূপের সাথে নিজেকে জড়িয়ে না রাখলে পুরো পুজোটাই যে একেবারে মাঠেমারা।

   মাগো,তুমি তো নিশ্চয়ই দেখেছো এতদিন প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে কী সেলফির কসরত। আট থেকে আশি সবাই যেন মায়ের রাতুল চরণে মাথা ঠুকে বলছে- আর একটু বেশিদিন থেকে যাও না মা। তোমরা না থাকলে কী করে এপাশ-ওপাশ করে সেলফি তুলবো ? কী করে ফেবুতে মেলে ধরবো নিজেকে ? আসলে মা, এবার মেঘাসুর মানে এক বিচ্ছিরি অসুর তোমাদের ফেমিলির এরাইভ্যালটাকেই বরবাদ করে দেবার সমস্ত রকম কৌশল নিয়েছে ।কিন্তু আমরা শুভবুদ্ধি সম্পন্ন ভক্তেরা সমস্ত রকম চক্রান্তকে প্রতিহত করে ঝড়জলের মাঝেই তোমাদের আগমনকে নিশ্চিত করেছি।কোন কার্পণ্য রাখিনি মা। নিজেরা খেতে না পারলেও আট কোটির গয়না পড়িয়েছি। নানা ঝলমলে দামী-দামী শাড়ি-কাপড়ে তোমাদের সক্কলকে সাজিয়েছি ।বন্যায় ত্রাণ শিবিরে কাটানোর পরেও তোমাদের জন্য অস্থায়ী বিশাল বিশাল প্যান্ডেল গড়ে তুলেছি। নিজেদের জীবনে ঘোর অন্ধকার থাকলেও তা ঢেকে দিয়ে তোমাদের আলোতে সাজিয়েছি। তবুও মা তোমরা মেঘাসুরের আস্ফালনকে এই কটা দিনের জন্য দমিয়ে রাখতে পারো নি । বছরে তো মা মাত্র কটা দিন । ভেবেছিলাম  ইলেকশান ইয়ারের আগের এই পুজোটায় সব্বাই মিলে চুটিয়ে নিশ্চিন্তে জম্পেশ আনন্দে কাটাবো। তাও করতে দিলে না । শরতে নিয়ে এলে অকাল বর্ষা । ঘরে বসেই টিভির লাইভ কাভারেজ ।  ঝড়জলে আবারো স্নান করিয়ে দিলে পাহাড় থেকে সমতলকে । তোমরা কী জানো না বৃষ্টিতে কী হয়ে যায় আগরতলার ?

       মাগো, বলো বিসর্জনের নাচে আমরা কী কোন ঘাটতি রেখেছি ? পথে নেমে নেত্য করেছি নার্সারী থেকে আশি । পাড়ার ক্লাবের আয়োজনে বিসর্জনের মিছিলে ১৮ বছরের মেয়েটিও কোমর দুলিয়ে অক্লান্ত নেচেছে তার ৩৯ বছরের কাকিমার সাথে । ঢাকের তালে নয় মা, পুরো নাচটাই পারফর্ম করেছি অর্কেস্ট্রার  সাথে । একটু ক্লান্তি এলেই রাস্তায় অকাতরে জল খেয়েছি । নাচতে নাচতে পা টলছিল পাড়ার বৌদির । তবুও তোমার জন্য রাজপথে আমার বৌদির নাচের কোন ঘাটতি ছিল না । মাঝে মাঝে গলা ছেড়ে বৌদির আকুতি- আসছে বছর আবার হবে । তোমাদের বিদায় জানাতে ইচ্ছে করে না মা । তবুও জানাতে হয় । সামনের বছর হাতে আরো বাড়তি কটা দিন সময় নিয়ে এসো । পারলে এক পক্ষকালের জন্য এসো মা । সকল মায়ের কান্নাকে মুছে দিতে আবার তুমি এসো আফটার ইলেকশান।

          লক্ষ্মী মা, এতক্ষণ তোমাদের ফ্যামিলি নিয়ে অনেক কথাই বলে ফেলেছি।সময় যখন পেয়েছি তখন দু’এক কথা না হয় একটু বাড়তি বলেই ফেললাম ।তাতে কী দোষ বলো মা ? এখন তো আর কেউ চিঠি লেখে না । আমার ছেলেমেয়ে বউ সব্বাই মেল, চ্যাটিং, অ্যাপ,ইন্সট্রা,ইউটিউব, ট্যুইটার এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকে । তারা তো ভুলেই গেছে চিঠি লেখা । আসলে যে কথাটি মা তোমাকে বলতে চাইছিলাম, তা হলো তোমার এরাইভ্যালটাকে একটু পিছিয়ে দেওয়া যায় না ? কারণ বাণভাসিতে আমার একমাত্র আয়ের উৎস মাঠের ফসল ভেসে গেছে । সব্জী খেতের অকাল পচন আমার চোখের সামনে এখন । বাণের জলে সবকিছুর সাথে ভেসে গেছে আমার ঠাকুরঘরের ঘটি-বাটি আর তুলসীতলার পিদিমখানিও। তোমাকে কোথায় বসতে দেই মা, আমার এই অগোছালো ঘরে ?

    মাগো, বিমুদ্রাকরণের আগে এবং জি.এস.টি চালু হওয়ার পর এটাই তোমার ফাস্ট এরাইভ্যাল । তাই কথায় কথায় এখন মা জি.এস.টি । নারকেল লাড়ু, কলা, আপেল,বাতাসা,নকুলদানা,আম্রপল্লব,বেলপাতা,তিল,দূর্বা,তুলসী,তিলেরনাড়ু,আতসবাজী,চাল,চিনি,আতপদুধ,ঘট,গামছা,ধান,হরিতকী,ঘৃত,মধু,কিচমিচ,ধূপ,আমসত্ব,পানসুপারী,পাঁচালী, সাগু-নাসপাতি, জিলিপি, বোঁদে এমন কী তোমার মূর্তিতেও জি.এস.টি লেগে গেছে মা। জি.এস.টির পুরোটা বুঝি না আমি। শুধু এইটুকু বুঝি, জি মানে ‘গরীবের’, এস  মানে ‘সর্বস্ব’ আর টি মানে ‘টাইট’। সোজাকথা গরীবের সর্বস্ব টাইট ।আর টাইট হতে থাকলেও তোমার রিসেপশনে কোন ঘাটতি রাখতে চায় না কেউ । পে-রিভিশন তো হয়েছে, অপেক্ষা এখন সপ্তমের দিকে। জানো মা ,এখন রেডিমেটের যুগ । তাই আমার গিন্নি এখন আর তিল, নারকেল বেটে নাড়ু বানাতে চায় না । হাতে-মুখের চামড়ায় ভাঁজ পরে যাবে যে তার , তাছাড়া ফেসবুক আর চ্যাটিং- এর জন্য তো এখন সময় রাখতেই হয় ।উলুধবনির ক্যাসেটটাও কিনে এনেছি অনেক আগেই । লক্ষ্মীর পাঁচালীটাও ব্ল-টুথে রিসিভ করে মোবাইলে সেফ করে রেখেছে গিন্নি।     আমপাতা,বেলপাতা,দূর্বা,তুলসী, ঢোল-জাবর, রেডিমেট ভোগ সবই এখন রেডিমেট। তাছাড়া কনট্রাক সিস্টেমের পুজোও এখন চালু । একটা ফোনই যথেষ্ট । ব্যস হোম ডেলিভারীতে পুজোর সব আয়োজন। শুধু অভাব মা একটাই তা হলো লাইভ পুরোহিত মশাই-এর। তোমার তো মা সিঙ্গেল এন্ট্রি। একেইদিনে তোমার এরাইভ্যাল রতন-মুকেশের কুটির থেকে এই নরাধমের প্রাসাদে। তাই পুরোহিতের আকালটাই ভীষণ প্রোব্লেমের।তাই বলছিলাম কী মা, তুমি কী উপার্জনের ক্যাটাগরীভিত্তিক আসতে পারো না ? আধার কার্ডের তথ্যানুসারে, ইনকামের উপর, পে-ব্যান্ডের ভিত্তিতে, বিপিএল অনুসারে তুমি কী তোমার এরাইভ্যালের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করতে পারো না মা ? তবে তাই করো । এটাই মা আবদার । পূর্ণ করো মা ।   

         জানো মা, আমার মতো অনেকেরই একটা অমূল্য আধার কার্ড, দুর্মূল্য বিপিএল কার্ড আর একটা জিরো ব্যালেন্সে ব্যাঙ্কের পাসবই রয়েছে । আমাদের  জন্য তুমি কবে আসবে দয়া করে একটু জানাবে কী মা । নিচের মোবাইলে অন্তত একটা এস এম এস দিও । এসো মা লক্ষ্মী – আবার এসো মা ।

 

আমরা জলপূর্ণ ঘটে দেবো সিঁদূরের ফোঁটা

আম্রের পল্লব দেবো শিরে এক গোটা

আসন সাজায়ে তাতে দিয়া গুয়া পান

সিন্দুর গুলিয়ে দেবো ব্রতেরও বিধান ।

ধূপদীপ জ্বালায়ে রাখিব ধারেতে

শুনিতে বসিব কথা দূর্বা লয়ে হাতে ।

          

 আজ এখানেই শেষ করছি মা । সকল ভক্তের মনোবাসনা পূর্ণ করো তুমি । ধনে-জনে, আনন্দে-বৈভবে, আহ্লাদে-আমোদে, জিএসটিতে, পে-কমিশনে, নতুন নিয়োগে, স্বচ্ছতায়, পূর্ণতায়, নতুন নতুন প্রকল্প নিয়ে তুমি এসো মা ।

                                                                                                                    ইতি

                                                                                                                    বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডের এক নরাধম

                                                                                                                    দেবাশিস লোধ

                                                                                                                    ফোন – ৯৪৩৬১৩০৩১৪

                                                                                                                    আধার নং – ৪৩৯১৮৬১৯৭০৪২