সপ্তাহের সাতকাহন - আগরতলার দুর্গাপুজো ২

Durga Puja / সপ্তাহের সাতকাহন:

চৌমুহনীর শহর বলে পরিচিত আগরতলা। কামান চৌমুহনী, আশ্রম চৌমুহনী, মঠ চৌমুহনী,  বিদূরকর্তা চৌমুহনী, ফায়ার ব্রিগেড চৌমুহনী, এডভাইজার চৌমুহনী, কর্ণেল চৌমুহনী, মরা চৌমুহনী, পোষ্ট অফিস চৌমুহনী, – এমন আরো অনেক চৌমুহনীর মাঝে রয়েছে  দুর্গা চৌমুহনী। প্রত্যেক নামেরই একটা পেছনে থাকে কাহিনি। কামান আছে বলে কামান চৌমুহনী, মঠ ছিল বলে মঠ চৌমুহনী ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু একসময়ের ‘মেথর চৌমুহনী’ বলে পরিচিত চৌমুহনীটি হয়ে গেল দুর্গা চৌমুহনী। তারও কাহিনি একটু অন্যরকম। রাজআমল থেকেই রামনগরের শেষ প্রান্তটি পরিচিত ছিল ‘মেথর চৌমুহনী’ হিসাবে।  হরিজন সম্প্রদায়ের জনগণের বসতি ছিল সেখানে। জাত-পাত-অস্পৃশ্যতাকে প্রতিহত করার জন্য হরিজন নেতা ক্ষীরোদ সেন মহোদয় প্রথম সেখানে হরিজনদের নিয়ে দুর্গাপূজার আয়োজন করলেন। অংশ নিলেন অনেকেই। তারপর থেকে এই চৌমুহনীটি পরিচিত হয়ে গেল ‘দুর্গা চৌমুহনী’ নামে।

রাজআমল থেকেই দুর্গাপূজার প্রচলন। রাজমালাতেও দুর্গাপূজার কথা উল্লেখ রয়েছে। কী লেখা আছে  তাতে ?

“দুর্গোৎসব, দোলোৎসব, জলোৎসব চৈত্রে

মাঘমাসে সূর্যপূজা করিল পবিত্র”।

১৮৪৪ সালে পুরাতন হাবেলি থেকে নতুন হাবেলী অর্থ্যাৎ বর্তমানের আগরতলায় রাজ্যপাঠ নিয়ে এলেন মহারাজা কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য।হাওড়া নদীর পাড়ে অল্পবিস্তর জনপদ । উত্তরে কুঞ্জবন টিলা আর দক্ষিণে রসমন টিলা(এর নাম এখন জগহরিমুড়া) ।মাঝখানে ডোবা, নালা বিস্তীর্ণ জলাভূমি । ১৮৭১ সালে তিন বর্গমাইল এলাকা নিয়ে আগরতলা পৌরসভা গঠিত হয় ।আর সেই সময়েই ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদেন এ ডব্লিউ বি পাওয়ার সাহেব । ১৮৭৪ সালের হিসাব অনুযায়ী আগরতলার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৮৭৫।অধিকাংশই ছিলেন রাজার আত্মীয়-পরিজন, রাজকর্মচারী,পাত্র-মিত্র ও পারিষদবর্গ । ফলে বারোয়ারি দুর্গাপুজোর কোন প্রচলন তখন শুরু হয়নি।রাজার আত্মীয়-পরিজন ও বিত্তবান রাজকর্মচারীদের বাড়িতেই আয়োজন হত দুর্গাপুজোর ।      

মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্যের আমল থেকে দুর্গাবাড়ির পুজো  জাঁকজমক আকার নিতে থেকে । সেকেলের আগরতলায় যেসব বনেদী বাড়িতে জমজমাট পুজো হতো তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রাজপ্রভু গোস্বামীদের বাড়ির পূজা, ব্রজেন্দ্র কিশোর দেববর্মণের বাড়ির পূজা, উজির বাড়ি, নাজির বাড়ি,কর্ণেল বাড়ির পূজা, হৃদয়  ঠাকুরের বাড়ি, অসিত ডাক্তারের বাড়ি, সুরেন্দ্র কবিরাজের বাড়ি, লেবু কর্তার বাড়ি, সতীশ দেববর্মণের বাড়ি, রেবতি মোহন ঠাকুরের বাড়ির পূজা।

এছাড়াও সেকেলের আগরতলায় আরো যে কয়েকটি বাড়ির পুজো স্বাতন্ত্র্যের দাবী রাখে। মহেন্দ্রকর্তার বাড়ির পুজোতে মূর্তি গড়া থেকে সবকিছু নিজেরাই নাকি করতেন।  সুরেন্দ্র কবিরাজের বাড়িতে দুর্গাপূজায় বলির প্রচলন ছিল। আর কবিরাজ মশাই নিজেই নাকি ছাগশিশু বলি দিতেন।

জয়নগরের শশী সেনের বাড়ির দুর্গামূর্তির বিশেষত্ব ছিল অর্ধেক অংশের রঙ হলুদ আর বাকি অংশ কালো। রাজকর্মচারি শশীবাবু স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে পুজার আয়োজন  করেছিলেন। ক্ষীরগোপাল কর্তা, কিংকর সাহা, নরসিং কর্তার বাড়ির পুজোয় আনন্দ ও  বৈভবে কম ছিলনা।

তবে দুর্গাপূজার মূল আকর্ষণ ছিল দুর্গাবাড়ি। রাজারা আসতেন দুর্গাবাড়ি ও প্রভুবাড়ির পুজোয়। অঞ্জলি নিবেদন করতেন। মহিষ বলির প্রচলন ছিল। প্রতিমার কারিগর হিসাবে সুনাম ছিল পীতাম্বর আচার্য এবং নরেশ আচার্যের। সোলার কাজের কারিগররা আসতেন ঢাকা থেকে। জেকশন গেইট থেকে দুর্গাবাড়ি চত্বরে জমজমাট মেলা বসত উনিশ শতকের পঞ্চাশ দশক থেকেই। পুজোর দিনগুলিতে রাজা মন্ত্রী, সান্ত্রী,প্রজা সব মিলেমিশে একাকার। নাচ-গানের মজলিশ হতো। জমজমাট যাত্রাপালা, ঢপযাত্রা আর ম্যাজিকের আসরে সারারাত মানুষ মাতোয়ারা। বিজলী বাতি ছিল না। গ্যাসের আলোই তখন ছিল মূল ভরসা। হ্যাজেকের আলোতে মায়ের মুখ থেকে যেন অদ্ভুত এক আভা বেড়িয়ে আসত ।   

দশমীর দিনে সব প্রতিমা রাজবাড়ির সিঁড়ির সামনে জড়ো হতো । সেখানে  রাজমহিষী ও অন্যান্যারা মা-কে বরণ করতেন । বের হতো শোভাযাত্রা । প্রথমে থাকতো প্রভুবাড়ির প্রতিমা, দ্বিতীয়টি দুর্গাবাড়ির প্রতিমা, এরপর একে একে অন্যসব।  শোভাযাত্রার একেবারে সামনে সুসজ্জিত হাতি ঘোড়া । হ্যাজাক লাইট আর ব্যান্ডপার্টির দল ।মা-কে নিয়ে শোভাযাত্রা এগিয়ে যেত দশমীঘাটের দিকে। মাটির ধুপতিতে জ্বেলে উঠা গরগুল ধূপের ধোঁয়ায় তখন ম-ম করত রাস্তাঘাট । কানঝালাপালা করা সাউন্ড সিস্টেমের তালে তালে আবালবৃদ্ধবণিতার রাস্তায় উদ্দাম নেত্য ছিল না তখন।  উলুধ্বনি আর শাঁখ বাজিয়ে মা-কে বিদায় জানানোর রীতি ছিল দীর্ঘদিনের  । সবাই মিলে তখন গাইতেন- “যাও গো তুমি যাবার আগে রাঙ্গিয়ে দিয়ে যাও । যাও – যাও যাও”।  ####

বিশ্বাস করুন, কৃত্রিম আলোতে বা সিন্থেথিক রঙ-এ তখন মায়ের মুখ সেজে উঠতো না।

ঋণ ঃ জগদীশ গণচৌধুরী, রমাপ্রসাদ দত্ত, করবী দেববর্মণ, রাজমালা, রাজধানী আগরতলা,একুশ শতক,