স্বপ্ন - দূর্বাঞ্জলী রায়

অণুগল্প:

|| স্বপ্ন ||

 

জয়ী আজ অন্যদিনের তুলনায় একটু আগেই বেরিয়ে গেল। অন্যদিনকার মতই সঙ্গী বেণুদি। অফিস থেকে বেরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি পাওয়া যায় না। তাই মোড়ের মাথায় তারা বেশ কয়েকজন গল্প করতে করতে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছিল। আজ জয়ীর মনটাও একটু ভার ভার। অবশেষে বাস এল। জয়ী ও বেণুদি খুব তাড়াতাড়ি বাসে উঠে পড়ল।

- নাহ...নিশ্চিন্তি...সিট আছে দুটো...চল চল জয়ী ওদিকে...

জয়ী বেণুদির পেছন পেছন এসে বসে পড়ল। কত কী বলছে বেণুদি। অফিসের কথা...সংসারের কথা...। অন্যদিন জয়ীও গলা মেলায় বেণুদির সাথে। কিন্তু আজ যেন ওর কী হয়েছে! কেমন একটা ঝিমঝিম ঘোর ঘোর ভাব। বেণুদির কোনও কথাই সে কর্ণপাত করছে না।

জানলা দিয়ে বাইরেটা একদৃষ্টে দেখছিল জয়ী। এই পথঘাট জয়ীর খুব চেনা। তবুও মাঝেমাঝে এই রাস্তার প্রতিটা বাঁক পেরোতেই ওর বুকে  একটা কাঠঠোকরা গর্ত করতে থাকে! আর মনে হয় তার হৃদপিন্ড নিংড়ে রক্ত বেরোচ্ছে খুব! এসব ভাবতে ভাবতেই জয়ীর চোখ টা লেগে গেলো...

 

মোবাইলটা ক্রমশ রিং হয়ে কেটে যাচ্ছে। জয়ীর হাত যেনো অবশ হয়ে আসছে। কিছুতেই ধরতে পারছে না সে ফোনটা। কোনওরকমে চোখটা খুলে দেখলো 65 মিসডকল.... জয়ী আনমনে বলে উঠল, স্বপ্ন!

কলবেক করার আগেই আবার রিং...

-হ্যালো...

-কীরে! তুই কোথায়? কতগুলো কল করলাম। ধরছিলিস না কেন ? ঠিক আছিস তো তুই ? কী হল জয়ী ?

-তুই কি পাগল স্বপ্ন ? 65 টা মিসডকল!!! এতগুলো কল কেউ করে একসাথে?

- কী করব। আমার চিন্তা হচ্ছিল খুব। এমন তো তুই করিস না কখনও ?

- বাহ: পারিসও বটে তুই। ঘুমিয়ে গেছিলাম রে।

- হ্যাঁ, পারি বটে । জানিস কী করেছি ?

- কী করেছিস?

- তোর বাড়ীর সামনে দিয়ে তিনবার বাইক নিয়ে চক্কর কেটে এলাম।

- সেকী! কেন! উফফফ

- কেন আবার। এমন ভসভসিয়ে ঘুমোয় কেউ ? চিন্তা হচ্ছিল তোর জন্য গাধা । আর কক্ষণও  এমন করবিনা বুঝলি ?

- আর যদি করি?

- আর এমন করলে গলা টিপে ধরব আমি তোর।

- এত ভালবাসিস তুই আমায় ?

- কেন, তুই বুঝিস না?

- উঁহু, বুঝতে চাই না আমি । অমন করে ভালবাসিস না আমায় please... আমি ভেঙে যাবো!

- তো ভেঙে যা। ভালো তো...

- ইশশ! এরপর আমার কী হবে?

- কী আর হবে। তোকে আমি আবার জুড়ব। নতুন নতুন রূপে। যখন যে রূপ আমার মনে ধরবে সেভাবেই সাজিয়ে রাখব। আর এমনি করেই বুকে জড়িয়ে রাখবো তোকে।

- আহা! সখ কত!

- হুমম, অনেএএক সখ...

- আচ্ছা হয়েছে, বুঝেছি। অনেএএক প্রেম হল। জলদি বাস থেকে নেমে বাসস্টপে দাঁড়া তো দেখি।

- তুই এসেছিস ?

- আজ্ঞে হ্যাঁ

- love u my ভুতুসোনা

 

দিদি...ও দিদি... বাসস্টপ এসে গেছে তো, নামবেন না ?

- হুঁ...হুঁ... নামব

বেণুদি কখন বাস থেকে নেমে গেছে বুঝতেই পারেনি জয়ী। স্বপ্ন ছিল ? স্বপ্নই হবে হয়ত । জলদি ভাঁড়া মিটিয়ে জয়ী বাস থেকে নামল। স্বপ্ন মরে গেলে আবার নতুন করে স্বপ্ন আসে। কিন্তু স্বপ্নটা যদি বিকৃত হয়ে বেঁচে থাকে তখন সে যে কী নিষ্ঠুর!

ধীর পায়ে হাঁটছে সে ফুটপাথ ধরে। বাসস্টপেজের চারপাশটা একটু চোখ বুলিয়ে নিল। জয়ী জানে কোথাও কেউ তার জন্য অপেক্ষাতে নেই । তবুও...। একটা দীর্ঘ নি:শ্বাস ফেলল জয়ী । তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল । ব্যস্ত জনপথ পেরিয়ে জয়ীর শরীরটা ছোট হয়ে আসতে লাগল । বিকেল গড়িয়ে শৈশবের মনখারাপের কারণ যেমন হয়ে ওঠে অস্তমিত সূর্য; জয়ীও যেন ঠিক তেমনি গোধূলি আলোর শেষটুকু নিভিয়ে দিয়ে কোনও এক দিগন্তরেখায় মিলিয়ে গেল!