সপ্তাহের সাতকাহন - শ্যালিকার নগর দর্শণ

সপ্তাহের সাতকাহন:

 

সেই কথা হক্কলেই জানেন, আমার একমাত্র শ্যালিকা অতীব সুন্দরী না হইলেও তিনি সুমুখশ্রী, ফর্সা, দীর্ঘাঙ্গী, দীর্ঘকেশী, সুঠাম, বিনয়ী, গৃহকর্মে নিপুনা, বুদ্ধিমতী, বিচক্ষণা, সুরসিক সংস্কৃতিমনা,উদার, নিরামিষাশী এবং ভ্রমণবিলাশী।গ্রামবাংলার জল হাওয়ায় তিনি বর্ধিষ্ণু হইয়াছেন।ফলে শহরের হাওয়া-বাতাস শরীরে লাগাইবার নিমিত্তে তিনি রাজধানী আগরতলায় আসিয়াছেন। শ্যালিকা আসিবার কারণে আমার গিন্নিরও একটু আদর–আহলাদ বাড়িয়া গেল বৈকি । এই প্রথম আমার শ্যালিকা  নগরে আসিয়াছেন। তাহাকে একটু খাতির যত্ন না করিলে জামাইবাবুর মান-সম্মান আবার থাকিবেক না ।এখনকার মতো আমার শ্যালিকা আবার আমাকে দাদাবাবু বলিয়া সম্বোধন করে না । সেইকালের মতো “জাইম্বু” বলিয়া ডাকিতেই সে অভ্যস্ত । নুন ছাড়া রান্নাবান্না যেমন বিস্বাদ, তেমনি শ্যালিকাবিহীন জীবনও চিরতার মতো ।  তাই গিন্নিকে বলিলাম- কিগো, শ্যালিকাকে কিভাবে খুশি করাইতে পারি ? এমন একটা বুদ্ধি বাতলাও যাতে খরচও কম হয় আবার শ্যালিকাও খুশিতে গদমদ হয় ।মাথায় রাখিও মাসের শেষ । তেল কমে ভাজা মুচমুচে হইতে অইব । গিন্নি সোহাগ মাখিয়া আমাকে বুদ্ধি দিল যাতে আমি শ্যালিকাকে লইয়া নগর সন্দর্শনে বাহির হই। বুদ্ধিখানা মন্দ নহে এই ভাবিয়া একমাত্র শ্যালিকাকে লইয়া আগরতলা নামক নগর দর্শনে বাহির হইয়া পড়িলাম । দামী গাড়ীতে ভাড়া বেশি মাথায় আসিতে শ্যালিকাকে বলিলাম – আজ তোমাকে লইয়া এমন একখান গাড়িতে করিয়া এই নগরে ঘুরিব যাহা তুমি কস্মিনকালেও ভুলিতে পারিবে না । একেবারে রাজকীয় কায়দায় । শ্যালিকা অতীব উদগ্রীব হইয়া এই ঝলমলে রাজপথে দাড়াঁইয়া আমাকে বলিল- “জাইম্বু” রাজকীয় কায়দাটা আবার কী ? আমি একটু গলাটাকে বেইসে নামাইয়া বলিলাম,- যেই গাড়িতে আমরা আজ চড়িব সেইরকম গাড়িতেই একদা  ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্য বাহাদুরও নগর সন্দর্শনে বাহির হইতেন ।বাহ কী মজা বলিয়া গিন্নী এবং শ্যালিকা লাফাইয়া উঠিল । আমিও খানিকটা পুলকিত হইলাম বটে । অবশেষে গাড়িতে উঠিলাম । ছোট্ট কুঠুরীর গাড়িতে শ্যালিকা গিন্নী পরিবৃত হইয়া আমি বাহির হইলাম এই নগরের পথে  । গাড়ি ছুটিয়া চলিল অনেকটা বাইট্টা ইন্দুরের লাহান । আর আমার কথার ফোয়ারাও শুরু হইয়া গেল । আগরতলায় প্রথম ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন হয় রাজাধিরাজ মাণিক্য বাহাদুর রাধাকিশোরের আমলেই । তেজীয়ান অশ্বে টানা সেই গাড়ি সেই আমলে অভিহিত হইত “টমটম” নামে । সুসজ্জিত টমটমে বেড়াইতে বাহির হইতেন রাজা, রাণী ও তাঁর আত্মীয় পরিজন । পথের দুইপাশে প্রজারা দাঁড়াইয়া সেই রাজকীয় দৃশ্য তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করিতেন । আজ অনেকটা সেই রকম কায়দাতেই আমিও যেন বাহির হইলাম । তবে কালের পরিবর্তনে অশ্বের বদলে সেই গাড়ি এখন টানে নির্জীব একখানা ব্যাটারী । পথের দুইপাশে কেউ ফিরাইয়াও তাকায় না বরং সু্যোগ বুঝিয়া ফোঁড়ন কাটে । রাজা নেই বটে তবে এই শহরে এখন দাপটাইয়া বেড়ায় টমটম । আদর করিয়া কেহ কেহ বলেন টুকটুক । নামে কী যায় আসে । টমটম ও টুকটুক সে-তো ভ্রাতা ও ভগিনীসম। শ্যালিকার হরিণ চক্ষুযুগল তখন আগরতলাকে দেখিতে লাগিল । আমি বলিলাম এই হইল শকুন্তলা রোড , এই পথে রবিবাবু অর্থ্যাৎ রবীন্দ্রনাথ প্রাতঃভ্রমণ করিতেন । শকুন্তলা রোড ধরিয়া সোজা দক্ষিণদিকে রাজকুমার ব্রজেন্দ্র কিশোরকে লইয়া প্রাতঃকালে হাঁটিতে হাঁটিতে ঊষাকালের শোভা দেখিয়া কবি বিমোহিত হইতেন । পথের দুই পাশে বিশাল বিশাল সিরিশ ও সেগুন গাছের লাইন । গাছের ডালে ডালে শকুনের বাসা ।আর শকুনের তলা বলিয়া রাস্তার নাম হইয়া গেল শকুন্তলা রোড । তাহা শুনিয়া কবি রবিবাবু সহাস্যে  ব্রজেন্দ্র কিশোরকে মন্তব্য করিয়াছিলেন – “খুব সুন্দর ও যথার্থ নামকরণ হইয়াছে রে । দুষ্মন্তের রাজ অন্তঃপুরে দুখিনী শকুন্তলা এবার চিরবন্দিনী হইলেন- কন্বমুনির আর চিন্তা রহিল না” । ।রাবীন্দ্রিক কথা শুনিতে শুনিতে শ্যালিকা ও গিন্নী একেবারে চমকাইয়া উঠিল । আরে কী যে কন জাইম্বু –এইখানে এত মানুষের ভীড় কিল্লাইগ্যা ? আমি দাদাগিরি দেখাইবার ঢঙ্গে বলিলাম – এইখানে কাল হইতে নতুন একখান খাওনের দোকান খুলিয়াছে ।চব্যচূষ্যলেহ্যপেয়র দোকান। লোকে বলে KFC। মানুষ দেহি হুগুনের লাহান এই দোহানে লাইন দিছে ? আমি বলিলাম ইডাই আগরতলা । মহারাজা বীরচন্দ্র কইতেন – এই শহর নাকি “হুজুগের শহর” ।সুযোগ পাইলে মানুষ ঝাঁপাইয়া পড়ে । এই বলিতে বলিতে নগরের নানাপ্রান্তে ঘুরিতে লাগিলাম । শ্যালিকাকে লইয়া গেলাম খোশবাগানে । বলিলাম এইখানেই ছিল আগরতলার প্রথম চিড়িয়াখানা । দিন পাল্টাইয়াছে ,বাঘ- ভাল্লুকেরাও তাদের সাকিন ও ঠিকানা বদল করাইয়া লাইছে। অবশেষে প্যারাডাইসে আনারস চৌমূহনিতে । কুইন আর কিউতে ম-ম গন্ধ । ইহার পর ছাদ দেওয়া রাস্তা দেখিয়া শ্যালিকা বলিল – জাইম্বু , রাস্তার উপর ছাদ ক্যান ? বৃষ্টি যাতে না পরে তার জন্যি কী ছাদ লাগাইবার কাজ চলিতেছে । ইহা শুনিয়া আমার জবাব দি বার আগেই গিন্নী বলিল – ইহা ছাদ নহে বোন – উড়ালপুল । ইংলিশে ফ্লাই-ওভার।  টমটম হইতে শ্যালিকা নামিয়া বলিল – জাইম্বু আমি ফ্লাই করিব । তাহাকে শান্ত করিয়া বলিলাম – একটু ধৈর্য্য ধরো । আর কিছুদিন পরে আমরা হক্কলেই ফ্লাই-করিব ।

      বেলা বাড়িয়া গেল । ক্ষুদাও বাড়িল । এদিকে শরীরের রসরক্ত দই হইয়া মাখনের লাহান বাহির হইবার উপক্রম । বেড়ানোর পর খাওন, ইডা একটা  নিয়ম । শ্যালিকাকে বলিলাম – তোমাকে আজ এমন একখান জিনিস খাওয়ামু যাহা বাঙ্গালির হাড়ে হাড়ে মিশিয়া আছে । কী জিনিস জাইম্বু ?খোলসা করিয়া বলিলাম – দুগ্ধের উপজাত দ্রব্য ছানা দ্বারা নির্মিত চিনির দ্রবণে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত সাদা গোলাকার রসালো সুমিষ্ট দ্রব্যটি তোমাকে খাওয়াইবার বাসনা জাগিয়াছে । ইহা শুনিয়া শ্যালিকা অকপটে জবাব দিলো – জাইম্বু, রসগোল্লা চাহি না একখান IODEX মলম কিনিয়া লন । সারাদিন শহরে ঘুরিয়া ঘুরিয়া গাইটে গাইটে ব্যথা দেখা দিয়াছে । কাজে লাগিবে ।