সপ্তাহের সাতকাহন - একটি পোড়া কাহিনি

সপ্তাহের সাতকাহন:

 

অবশেষে এনারা বাজারে এলেন। এই মরশুমে এনারাই এখন বাজারের  কুলীন সম্প্রদায়। চিটগুড়ের সঙ্গে যেমন পিপঁড়ের সু-মধুর সম্পর্ক, তেমনি শীত এলেই এনাদের দুজনের বেশ পিরীতির সম্পর্ক উথাল-পাতাল। একজন আরেকজনকে  ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ ।একজন তেলেগুণে ভরপুর, আরেকজন সুগন্ধির জন্য এইসময়ে বাজারের কূলচূড়ামণি । লেইকচৌমূহনির সকালের বাজারে একজন এলেন দোকানীর খাঁচায় ভর্তি হয়ে আর সেই সঙ্গে তিনি এলেন অনেকটা গয়নার বাক্সের মতো সযত্নে লালিত ছোট্ট পুঁটুলিতে করে । সেই দোকানি একে একে তার খাঁচা থেকে    বের করে সাজাতে শুরু করলেন শিরদাঁড়া সমেত মোহনপুরের ঝিঙ্গে, একাদশীর বিধবার মতো বামুটিয়ার কাকরোল, মুখ চুপসে যাওয়া কল্যাণপুরের পটল,ধপাস  করে বস্তা থেকে ঢেলে দিলেন জলন্ধরের আলু আর প্যাকেট থেকে খুলে নিলেন খাসিয়া পাহাড়ের ঢালে জন্মানো ফুলকপি, টমেটো আর গাজর । তখনো আরো তিনটি-চারটি প্যাকেট খোলার বাকী। আমরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি সেই সব প্যাকেটের দিকে । কী সেই মহার্ঘ তার ভেতরে ? আরো দুটি খাঁচার উন্মোচন ঘটল । বেড়িয়ে এলো সিধাই এর কুমড়া আর বক্সনগরের মূলো । ন্যাটো ছেলেটার মতো সামান্য একটু কলাপাতায় মুড়ে শুয়ে আছে চম্পকনগরের ঢেঁকির শাঁক । আর উন্মোচনের বাকী রইল চটে মোড়া একটি মাত্র খাঁচা এবং ছোট্ট ঐ পুঁটুলিটা । ততক্ষণে আমার মতো ক্রেতাদের চোখের সংখ্যা  আরো বাড়তে লাগলো। দোকানি বেশ পরিপাটি করে খুলেই চলেছেন খাঁচাটি । আমাদের ডাগর ডাগর চোখ খাবলে পড়েছে তারই উপর। খাঁচার উপরিভাগ থেকে প্রথমে খোলা হল চটের আচ্ছাদনটি। যেন রবীন্দ্রভবনের মঞে কোন নতুন বই-এর মলাট উন্মোচন । এরপর দ্বিতীয়টি আচ্ছাদনটি খুলতেই আবছা আবছা কুচকুচে রঙ এর কী যেন উকিঝুকি দিতে শুরু করল। তারপর কাগজে মোড়া শরীর বে-আব্রু  করতেই তিনি আত্মপ্রকাশ করলেন । দোকানি হাঁক ছেড়ে ডাকতে লাগলেন - “আইয়েন দাদা-দিদিরা,  শীতের রাজা তেইল্যামুড়ার বাইগুণ, না খাইলে আপচুষ চাইরগুণ। বেগুনের তেলেই বেগুন ভাজা, সিদ্ধ-পোড়া এক্সটা । ভীড় তখন বাড়তে লাগল। বেগুনের  তো দেখা পাওয়া গেল – কিন্তু ওই সর্বশেষ  পুঁটুলিটাতেই বা কী ? সিনিয়র সিটিজেন এক ভদ্রলোক তখন আর তর সইতে পারছিলেন না । তিনি জিজ্ঞেস করেই ফেললেন – ভাই,তোমার ঐ এটাচির মতো বাক্সটাতে কী ? রসিক দোকানদার  বাক্স খুলতে খুলতে উত্তর দিলেন –

একটি পাতা দুটি কুঁড়ি /স্বাদ আনবে ভুরিভুরি /অল্পেতেই তার জারিজুরি ।

###

এই শীতেও চাই মহেন্দ্র দত্তের বড়বড় ছাতা  

খিচুড়ির সাথে ছিটিয়ে দিন শীতের ধনেপাতা ।   

দোকানীর কাব্যগুণে আমি আপ্লুত । ডাগর-ডাগর তেলতেলে বেগুন আর দুটি কুঁড়ির ধনেপাতা দেখে যেন প্রথম দেখা প্রেমিকার লাজুক মুখখানার কথা মনে পড়ে গেল । সাহস করে দোকানদারকে বললাম – বেগুনের কেজি কত করে ? আর ধনেপাতাই বা কত ?   

দোকানী আমার দিকে তেছড়া করে তাকালেন । মনে হল তিনি আমার পোশাক দেখছেন । খুঁজছেন কোন ব্রেন্ডেড কোম্পানীর পোশাক আমাকে ঢেকে রেখেছে কিনা  !অবশেষে বিরক্তির ঢংগে উত্তর দিলেন– বেগুন মাত্র ১২ টেকা শ আর এক চিমটি  ধনেপাতা ১৫ টেহা ।এরসঙ্গে জিএসটি যোগ কইরা নিয়েন । ভেতরে ভেতরে যোগ বিয়োগ চলছে । একবার মানিব্যাগ খুলছি আরেকবার হিসাব করছি । ওদিকে বাজারে আসার সময় গিন্নি বলে দিয়েছেন আর চারাপোনা ওনার  ভালা লাগে না।  পাবদা আর পারলে বড় সাইজের চিংড়ি আনার জন্য । ছেলেটার আবার বড় কোলের মাছ প্রিয় । বিশ্বাস করুন আমার না ভীষণ ইচ্ছে করছে – একটু বেগুন পোড়া আর ধনেপাতা মাখা খেতে । এইসব উটকো ইচ্ছে আর পকেটের হিসাব করতে করতে দু’তিনবার দোকানীর গালাগাল শুনতে হয়েছে । সবাই যখন কেনার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত আমি তখন  হিসাব নিয়েই তালু হাতিয়ে খালি করে দিচ্ছি । তবে আমি কী  হেরে যাছি ?আমার কপালে কী আর বেগুনপোড়া ও ধনেপাতার অচ্ছেদ্য প্রেমের মাখামাখি জুটবে না  ? ধুম করে পকেট ঝেড়ে বের করে দিলাম  ।দেখিয়ে দিলাম ব্রেন্ডেড কোম্পানীর পোশাক না পরেও আমার সাহসখানা । অবশেষে একটা বেগুন আর এক চিমটে ধনেপাতা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গিন্নিকে মাখো-মাখো সুরে বল্লাম – কই গো, বেশ জমিয়ে একখানা বেগুনপোড়া আর ধনেপাতা চটকে দাও না। কাঁচালঙ্কা কুচি আর খাঁটি সরিষার তেল দিতে একদম ভুলো না কিন্তু । হুম করে ঝটকা মেরে গিন্নি হেঁসেলে চলে গেলেন । আমিও চান-সন্ধ্যা সেরে গায়ে সরিষার তেল মেখে চাটাই বিছিয়ে পাতে বসলাম । কাঁসের থালায় গিন্নি সাজিয়ে আনলেন সাধের বেগুন ভর্তা। তা দেখে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ । এ কি গো – এ যে আধা-গ্যাঁচরা বেগুন মাখা ?   

গিন্নি মুখ খ্যাঁচকিয়ে জবাব দিলেন – বেগুনের অর্ধেকটাই তো পোকা, তার উপর গ্যাসে পুড়তে গিয়ে গ্যাসটাও মাঝপথে শেষ। আর একচিমটে ধনেপাতায় ঝেরেপোছে অর্ধেকটাতেই ঘাস । তা আমি কী করব ? বেগুন পোড়া দিতে গিয়ে তো মুখে আগুনের হিট লেগে দ্যাখো কী অবস্থা হয়েছে । দেশে এতো সব চিকেন থাকতে এখন কী কেউ আর এসব বেগুন পোড়া খায় ?

আমি নিরুত্তর ।পাতের আধা-গ্যাঁচরা বেগুনটাকে আদর করতে করতে ভাবছি –তখন আমার ইলাস্টিকের হাফপ্যান্ট । কুয়াশার চাদর জড়িয়ে শীত আসতো । আর শীত এলেই মা উঠোনের মাটির চূলায় গনগণে আঁচের কয়লার আগুনে বেগুনে তেল মেখে পোড়া দিতেন । ছাল-চামড়া ছাড়িয়ে থালায় রাখতেন । সদ্য আনা সুঘ্রাণের ধনেপাতা কুচি আর কাঁচালঙ্কা মিশিয়ে দিতেন । খাঁটী সরিষার তৈল মেখে দিতেন তার সাথে । হাঁড়ি থেকে গরম-গরম ধোঁয়া উঠা ভাত পাতে তুলে দিতেন । পরম তৃপ্তিতে খেয়ে নিতাম ঐ একটি মাত্র আইটেমে। তখন অবশ্য এই ভরা শীতে নিম্নচাপ থাকতো না, ধনেপাতায় জিএসটিও ছিল না। দোকানী ক্রেতাকে অতিথি ভাবতেন । এমন কী উনুনের গণগণে আঁচে মায়ের মুখখানিও যেন তখন বেশ উজ্জ্বল সপ্রতিভ দেখাতো ।

####

এ কী কালের সুসময় না দুঃসময় ?