সপ্তাহের সাতকাহন - আগরতলার দুর্গাপুজো ১

দুর্গাপুজো / সপ্তাহের সাতকাহন:

কোথায় শিউলি ফুল? কোথায় নীলাকাশে সাদা মেঘের পেঁজা তুলা?  তবে কি শরৎ   পালিয়ে গেল? এ প্রশ্ন আমার নয়, আমাদের । তবু ও ক্যালেন্ডার বলে একটা জিনিস তো এখানো আছে। পাঁজিপুঁথি অনুসারে এই সপ্তাহটা বিশুদ্ধ শরৎকাল। শিউলি ফুটুক বা না ফুটুক, সাদা মেঘ ভেসে বেড়াক বা না বেড়াক শরৎ এসেছে এবং এই আগরতলায় দুর্গাপুজো হচ্ছেই এটা এখন নিশ্চিত। কারণ ঘোর শরতে পুজোর আগেই ঘোরতর বর্ষা। বৃষ্টিতে ভিজে কাবু এই শহর আগরতলা।

আগরতলায় এখন কমবেশি সাড়ে চারশো দুর্গোৎসব । রাজঅন্দর বা জমিদারের অন্দর থেকে বেরিয়ে এসে দুর্গোৎসব এখন সার্বজনীন । কিন্ত আগরতলায় বারোয়ারী দুর্গাপূজার অতীতটা কেমন? এখনকার বারোয়ারী তো দেখছি- পেছনের দিকটা কেমন ছিল?  

সব কিছুরই একটা প্রেক্ষাপট থাকে । শুরুর ইতিহাসটাও ঝঞ্জাবিধ্বস্ত । ১৯৪৭ সাল । দেশভাগ। উদ্বাস্ত স্রোত এ রাজ্যে।একটা অবিশ্বাসের পরিস্থিতি। মানুষে মানুষে জাতিগত সন্দেহের আবহ । এমন এক অস্থির পরিস্থিতিতে আগরতলা কিছু উদ্যমী যুবক স্থির  করলেন সম্প্রীতির নিদর্শন হিসাবে তাঁরা বারোয়ারী দুর্গাপূজার আয়োজন করবেন । পশ্চিমপাড়া সার্বজনীন দুর্গোৎসব নামে তখন তারা প্রথম বারোয়ারী দুর্গাপূজার আয়োজন করলেন পোস্ট অফিস চৌমুহনীতে । সেই পূজা কমিটির সম্পাদক ছিলেন চুনি বসু । উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হরেন্দ্র কিশোর দেববর্মণ (হরিকর্তা), নেপাল চক্রবর্তী, অনিল চন্দ্র ভট্টাচার্য়, টিপু সিংহ, প্যারা মিঞা, মঙ্গল সিংহ, সুধা চন্দ, সুধাংশু দত্ত আরো অনেকে ।

সাতচল্লিশের প্রথম বারোয়ারী দুর্গাপূজাও ছিল ‘বিগ বাজেটের’ । মহারাজার দেহরক্ষী মূর্তি বানিয়েছিলেন । সেদিনের মূর্তি বাবত খরচ হয়েছিল তিনশত টাকা । পুরোহিতের দক্ষিণা ছিল দশ টাকা । তবে পুরোহিত পাওয়া নিয়ে তখন পুজো উদ্যোক্তাদের কম হ্যাপা পোহাতে হয়নি । কারণ বারোয়ারি পূজা বলে কোন পুরোহিতই পুজো করতে রাজী ছিলেন না। কারণ জাত-কুল-মান হারাবার ভয় তো রয়েছেই। শেষমেশ উদ্যোক্তারা রাজী করান অমুল্য পুরোহিতকে।  

অষ্টমীর দিন মহাপ্রসাদ বিতরণ। সদলবলে রাজা এলেন বারোয়ারি পূজায়। প্রসাদ তুলে দিলেন গোপাল হরিজনসহ অন্যান্যরা। এখনকার মতো অর্কেস্ট্রা ছিলনা। তবে ‘রসুনচৌকি’ বাদ্যের সুনাম ছিল সেইসময়। দেড়শ টাকা দিয়ে চারদিনের বুকিং। প্রতিরাতেই যাত্রাপালা। রানীরবাজারের ‘খদ্দর’ পার্টির যাত্রাপালায় ছিল মানুষের ঢল। সবধর্মের মানুষের মিলনতীর্থে পরিণত হয়েছিল আগরতলার প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপুজা।

১৯৪৮ সালে চন্দ্রমনি আচার্য ও যামিনী আচার্যের উদ্যোগে বারোয়ারী দুর্গোৎসব হতো। এরপর কের চৌমুহনি, কাঁসারীপট্টীর কুমার ক্লাব, রামনগরের আলোক সংঘ, কল্যাণ সংঘ ও দুর্গা চৌমুহনিতে সার্বজনীন দুর্গোৎসবের আয়োজন শুরু হয়। ধীরে ধীরে বলদে যাচ্ছে আগরতলা। আর সার্বজনীন দুর্গোৎসবেও বৈচিত্র্যতা আসছে সময়ের হাত ধরে। পুজোর সেইসব কাহন পরের সপ্তাহে।

---------------

ঋণ ঃ রমাপ্রসাদ দত্ত, করবী দেববর্মণ,  হরেকৃষ্ণ প্রভু গোস্বামী, সুদর্শন মুখোপাধ্যায়।একুশ শতক, রাজধানী আগরতলা,