সপ্তাহের সাতকাহন - অগোছালো কথোপকথন

সপ্তাহের সাতকাহন:

 

কী চেয়েছি - আর কী পেয়েছি সেই নিকেশ করতে করতেই  একটা বছর হারিয়ে গেছে আমার জীবনকালের বিস্তীর্ণ সীমারেখা থেকে । যা চেয়েছিলাম তা কী পেয়েছি ?কিন্তু আবার  যা চাইনি সেটাও তো পেয়েছি । এই চাওয়া পাওয়ার অনন্ত জিজ্ঞাসার মাঝে আমিও একদিন মিশে যাবো  বিকেলের সূর্যাস্তের মতোই।  আজ সকালেও ঘুম থেকে উঠে দেখি সেই পরিচিত  সূর্যটাকে । একইভাবে আমার হেলানো বারান্দায় এসে লুটোপুটি খাচ্ছে । কোন গরিমা নেই তার । আমি কোন তফাৎ খুঁজে পাইনা কাল আর আজ সকালের মধ্যে । কাল যে সূর্যটা আমাকে শাসন করেছিল , সোহাগ করেছিল আজও  ঠিক একইভাবে আমাকে পরম যত্নে লালন করেছে সে । তার কোন হিসেব-নিকেশ  নেই, কোন কৃপণতা নেই ।  আমি  ঠিক যেন আজও দেখছি সেই দীপ্যমান আগুনের গোলার মতো একটা পিন্ডকে যে  আমার প্রত্যেকটি পিতৃপুরুষের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়েছিল কতকাল আগে থেকে । শুধু  আজ এটুকু আমি অনুভব করেছি বারান্দায় রাখা আমার আরাম কেদারাটা যেন একধাপ নিচে নেমে গেছে । চশমার কাঁচটা কাল থেকে আজ ক্রমশ  ঘোলাটে হয়ে গেছে  । যে  রাতের গর্ভে হারিয়ে গেল আমার  একটা বছর সে  আমার সামনে রেখে গেল একটা  সংখ্যা -  ১০,৩২৩ । আমার সামনে রেখে গেল কত অসহায় মায়ের কান্না । সীমান্তে দাঁড়িয়ে যে বন্ধুটি আমাকে নিরাপদে  রাখার  ভারি অস্ত্রটি বহন করছে  তার কাছেও আজ আর কালের মধ্যে কোন তফাত নেই । কর্তব্য আর লক্ষ্যে সে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে সময়ের কাছে । সীমান্তের কাঁটাতারের উপর আর পাঁচটা দিনের মতোই সে-ও দেখেছে পড়ন্ত বিকেলকে । ছোট্ট মেয়েটি তার অপেক্ষা করছে কখন রাত পোহাবে । বাবা তার ঘরে ফিরবে । এইসব অনেক অনেক ভাবনার পাহাড় আমার চারপাশে । এরই মধ্যে     ডি-এ , প্রমোশন , ফিক্সড- পে , আধার কার্ড , প্যান কার্ড , সংরক্ষণ মামলা, সিবিআই , মিছিল , সমাবেশ , রাষ্ট্রপতি শাসন, ভোটার তালিকা , নির্বাচন - অনেক কিছুই আমার সামনে রেখে পালিয়ে  গেল একটা বছর । আমি অবাক বিস্ময়ে শুধু ভাবতেই থাকি । অবিন্যস্ত, অগোছালো ভাবনায় রাত  কাটে  ।

       ওদিকে আজই ছিল আমার চাকুরি জীবনের শেষ দিন । অফিসের সাইকেল স্ট্যান্ডে বিদায় সংবর্ধনার পর আমার কাঁধে সহকর্মী একজন জড়িয়ে দিলেন একটা শালের চাদর , হাতে তুলে দিলেন একটা  “কথামৃত” । রস নিংড়ানো মিস্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে ঘরে ফিরলাম । সঙ্গে নিয়ে এলাম একগুচ্ছ স্মৃতি আর শেষবেলায় সহকর্মীদের আবেগতাড়িত প্রশংসাসূচক কিছু শব্দমালা । আমার ভাবনায় তখন আরো  হিসেব- নিকেশ । পি-এফ,  গ্র্যাচুয়িটি, লিভ-স্যালারি, জীবন বীমা , আবিভা  , টাটা – এ আই  জি , ম্যাক্স লাইফ, এইচ দী এফ সি , এস বি আই লাইফ  হাবিজাবি আরো কত কী । মগজ জুড়ে শুধু ভাবনার হা-ডু-ডু খেলা । এভাবেই কী একটা একটা করে বছর হারিয়ে যাবে আমার প্রিয় জীবনকাল থেকে ? নিজের সঙ্গে সঙ্গে নিজের যেন বনিবনা হচ্ছিল না আজ রাতে । তবে কী এই বৈপরিত্যের জন্যেই এই পৌষমাসেও শীত উধাও ?  

           উল্টোদিকে আমার গিন্নির মোবাইলে ম্যাসেজের পর ম্যাসেজ আগমনের শব্দ ।  ইনবক্সটি সারা রাত সজাগ । ক্রমাগত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে নতুন বছরের শুভকামনায় । বিনিদ্র বাঙালি হিসাবে আজ দেখেছি নিউইয়ার পার্টি থেকে গভীর রাতে আমার ছেলের টলমলে  বাড়ি ফেরা । চ্যালেনশাসিত  মেয়ে আমার তীব্র আবেগে বুঁদ হয়ে আছে আলো-আধাঁরী নাচের জমজমাট লারেলাপ্পা আসরে । পাড়ার ছেলেরা তখন তীব্রস্বরে মাইক বাজিয়ে নিউ ইয়ারকে সেলিব্রেট করছে । গানের কথাগুলো আমাকে আজ নাড়া দিচ্ছে না । শুধু ড্রামবিটের একটা ঝনাৎ-ঝনাৎ শব্দ বুকের ভিতরে বাজছে । এভাবেই রাত  ফুটে যখন একটা সকাল বেড়িয়ে এল তখন আমি দেখলাম আমার চামড়ায় কুঞ্চিত ভাঁজ । একটা নতুন ক্যালেন্ডার লেগে আছে পুরোনো দেয়ালে । রাতজাগা বাড়ির সবাই তখনও ঘুমিয়ে আছে । আমি বারান্দায়, গায়ে আমার বছরের প্রথম রোদ্দুর , যেন কাল সকালের মতোই আমাকে জড়িয়ে রেখেছে ।  আমি লুকিয়ে লুকিয়ে বরণ করে নিলাম ২০১৮- কে ।আর  অগোছালো কথোপকথনে নিজের সঙ্গে নিজেই শপথ নিলাম এক আনন্দময় , নির্মল ও হিংসামুক্ত পৃথ্বীর জন্য ।

####

বন্ধু, আজ সকালেই হাতটা বাড়িয়ে দিলাম – আপনার হাতের উষ্ণতার জন্য ।