বিশ্বাসঘাতক - স্মিতা রায়

অণুগল্প:

|| বিশ্বাসঘাতক ||

তিনটি বছর নামে ‘রাজা’ কাজে ঠনঠন আমার সাথে প্রেম-প্রেম খেলার পরে বুঝি টিনার বোধোদয় হল। পাকা খবর পেলাম, দালালবাবুর টাকায় মজেছে টিনা, আগামী বুধবার বিয়ে। আমি ভেতরে ভেতরে চূর্ণ হয়ে গেলাম । টিনা ফোনের পর ফোন করল, ধরলাম না। টিনাকে ব্লক করলাম, যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম, তবু মনের জ্বালা কমল না। বুধবার সন্ধ্যেবেলায় টিনা যখন ফুলের মালা পরিয়ে দালালবাবুর গলায় ঝুলল, আমিও দড়ির মালা পরে সিলিং ফ্যানে ঝুলে গেলাম।

সবকিছু খতিয়ে দেখে যমদূত আমাকে স্বর্গেও পাঠালো না, নরকেও না, পাঠালো সোজা ভূতের জগতে, আত্মহত্যা অপমৃত্যু কিনা, তাই। নধরকান্তি শরীরটার বদলে পেলাম একটা কংকালের খটখটে দেহ। 

ভূতপুরীতে এত আমোদের মাঝেও মনের জ্বালা আমার পিছু ছাড়ল না, মাথা গুঁজে পাথরে বসেছিলাম, আমার কাঁধে হাত রেখে কেউ বললো, ‘কিঁ রেঁ, নঁতুন এঁলি? পেঁরেমের ভূঁত? তাঁই মঁন খাঁরাপ? চঁল আঁমার সাঁথে, এঁখানে অঁনেক মঁজা’। আমি বুঝলাম, এই ভূতপুরীতেও হৃদয় আছে, প্রেম পিরীতি হয়, এরাও টিনার থেকে ঢের ভালো।

আমার ইতিহাস শুনেটুনে আমার নতুন ভূতিনী প্রেমিকাটি চড় মারল। ‘ভূঁতের মঁতন ভূঁত হঁইয়ে বাঁচতে শিঁখ্। ওঁসব দেঁবদাঁসপনা ভূঁতের জঁগতে মাঁনায় নাঁ। বিঁশ্বাঁসঘাঁতক মেঁইয়েঁটিঁর ঘাঁড় মঁটকে দিঁই চঁল্। কিঁছু ভাঁলো কাঁজ কঁরলেঁ আঁত্মার শাঁন্তি পাঁবি।’

ভূত হওয়ার সুবিধে হল, যখন যেখানে খুশি চলে যাওয়া যায়, আলো না থাকলেও দেখা যায়, আর লোকের না বলা মনের কথাটিও বেশ শোনা যায়। আমি পরম আবেগে নতুন প্রেমিকার মাংসবিহীন হাতের হাড়ে ধরাধরি করে হাজির হলাম টিনার নতুন ঘরে। 

উঃ আজ সোহাগরাত, ফুলে ফুলে সাজানো তাদের খাট। দালালটাও বেমানান সেজেছে, দেখে হাসি পেল। সে টিনাকে কাছে টেনে নিয়ে ঘরের আলো নিভিয়ে দিল। দালালটা টিনাকে চেপে ধরছে, আর মনে মনে বলছে, ‘যাবি কই রে মাগী। সৎ মা তো তোকে বেচেই দিল আমার কাছে। তোর বাবার ক্যান্সারের চিকিৎসা হবে আমার টাকাতে, আর আমি বুঝি তার উসুল তুলবো না?’ আর টিনাও একটি নিষ্প্রাণ চুমু দিল স্বামীর গালে, কিন্তু একি? টিনা যে মনে মনে চুমুটি খেল তার রাজাকে! টিনার পুরো মন জুড়ে রাজার, মানে আমার মানুষজীবনের ছবিটি ভাসছে। টিনা নিঃশব্দে কাঁদছে আর মনে মনে বলছে, ‘শুধু তোর জন্য রাজা, আমি যে মরতেও পারলাম না। আমি বিষ খেয়েছি শুনলে যে তুইও বিষ খেয়ে মরবি’।

ভূতিনী এক ঝটকায় আমার হাত থেকে তার হাত ছাড়িয়ে নিল, আমাকে চড় মেরে বললো, ‘বিঁশ্বাঁসঘাঁতঁক’।